গ্রামের মাটি এখন নাম নেই, শুধু ছাই আর ভাঙা পাথর।
চার বছর আগে সে ঢাকার বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে আসে স্
বামীর খামখেয়ালের কারণে, আর সে এখন শুধু অবশিষ্টা
ংশের নামে জমির দাবি করে। স্মৃতিকথা নামের কাগজটা
তার হাতে এসেছে বাবার মৃত্যুর পর, আর সে সেই কাগজ
নিয়ে গ্রামে ফিরে এসেছে—মাটির টানে ঘুরে ঘুরে চাল
ানো স্মৃতির ভাঙা পুতুলের মতো।
গ্রামের পুরনো মসজিদ মাটির উপর উঁচু হয়ে দাঁড়িয়
েছে, আর সেখানে মুক্তিযুদ্ধের দুর্গ নামে এক নাম ল
েখা। সেখানে তার স্বামীর ভাই এখন মুফতি হয়ে গেছে—
আর সে এক কাগজে লিখে দেয় যে এই জমি মুসলিম কাফেলা
র জন্য স্মৃতিকথা অনুযায়ী বরাদ্দ করা হয়েছে। কিন
্তু জমির কাগজে তার নাম আছে, আর মাটির টান তার কান
ে বলে যে সে আসেনি শুধু দাবি জোর করে—সে আসে নিজের
মাটির গল্প মুখে ফেরাতে।
সে এক রাতে পুরনো পুকুরের পাশে বসে মাটির গভীরে হা
ত দেয়—যেখানে তার বাবা পাঁচ বছর আগে এক মাটির সাক
্ষী হিসেবে গোপনে লেখা কাগজ গাছের মূলে রেখে গেছিল
েন। কাগজে ছিল মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা নয়—বরং এক
বিধবা নারীর অভিযোগ, যে তার স্বামীকে মুক্তিযুদ্ধ
ের সময় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল কারণ সে হিন্দু
ছিল আর একটি গোপন রাজনৈতিক আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছ
িল। সেই সাক্ষ্য কাগজে লেখা হয়েছে এক ধর্মীয় বিভ
্রান্তির ভাবে—যে ভাবে এক গোপন আদালত সব হিন্দু মু
ক্তিযুদ্ধ সহযোগীদের নাম বাদ দিয়ে সাক্ষ্য দিয়েছ
িল।
তার হাতে কাগজটা মাটি থেকে উঠে এলো। কাগজের এক কোণ
ে লেখা: “যারা মাটি থেকে ফিরে আসে, তাদের আর ফিরে
যাবার জায়গা নেই।” সে কাগজটা চুপিচুপি কাপড়ে লাপ
িয়ে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে। সেই রাতে মুফতির বাড়ি
তে আগুন লাগে—আগুন সে মাটির কাগজ দিয়ে জ্বালানো হ
য়েছিল। কিন্তু সে কাগজটা নিয়ে কাপড়ে লাপিয়ে রে
খেছিল—আর আগুন তাকে ছুঁয়ে না গিয়ে শুধু কাপড়ের
কিছু কালো হয়ে গেল।
পরদিন গ্রামের মাটির নাম বদলে যায়—“মুক্তিযুদ্ধের
মৃত স্ত্রীদের মাটি” হিসেবে নামকরণ করা হয়। সে আ
র কোথাও যায় না। সে এখন মাটির পাশে বসে আছে—আর মা
টি তার নাম জানে। হৃদয়বিদারক আবিষ্কারটা এখন মাটি
র গভীরে শুয়ে আছে—তার নাম আর কোনো স্মৃতিকথা নয়,
শুধু এক পরিত্যক্তা স্ত্রীর মাটির টান।


